চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই চুক্তি করতে জোরেশোরে বিভিন্ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু গতকাল পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ ইজারা চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুক্তির বিস্তারিত পর্যালোচনায় সময় চেয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
যদিও বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই করা। কিন্তু বন্দরের জেটি থেকে শুরু করে বহির্নোঙর পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া কর্মবিরতি কর্মসূচির কারণেই শেষ পর্যন্ত সরকার এনসিটি ইজারা চুক্তি থেকে শেষ মুহূর্তে সরে গিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনা ও উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। সে বছর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। সেই সমঝোতার মাধ্যমে টার্মিনালটির সম্ভাব্য পরিচালনা, বিনিয়োগ কাঠামো এবং ভবিষ্যতে কনসেশন চুক্তির রূপরেখা বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা এগিয়ে নেয়ার ভিত্তি তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চূড়ান্ত ধাপের আলোচনা শুরু হয়।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হয় ২০০৭ সালে। ধাপে ধাপে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি স্থাপনে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০১৫ সাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকা এ টার্মিনাল বর্তমানে বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক স্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও ২০১৯ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার এনসিটি বিদেশী অপারেটরের হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। ওই সময় জিটুজি ভিত্তিতে এনসিটি পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
পিপিপি কাঠামোর আওতায় বিদেশী অপারেটর নিয়োগের পথ খুলে দিতে ২০১৭ সালে নীতিমালা প্রণয়ন এবং ২০১৯ সালে পিপিপি আইনও এ উদ্দেশ্যে সংশোধন করা হয়। ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে টার্মিনাল পরিচালনার অনুমোদন দেয়। ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি)।
আওয়ামী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। পিপিপি কর্তৃপক্ষ ও বিডার নেতৃত্বে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া বরং আরো গতি পায়। বন্দরসংশ্লিষ্টরা জানান, পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনায় বিদেশী অপারেটর যুক্ত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশী অপারেটরের হাতে দেয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছর হাইকোর্টে রিট করেন বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন। রিটে পিপিপি আইন ও নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া জিটুজি ভিত্তিতে চুক্তি করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। মামলার শুনানি শেষে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিভক্ত রায় দেন। এ আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায়ই অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যায়ন কমিটি গঠনসহ এনসিটি ইজারার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে থাকে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, দরপত্র সংশোধন, টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ইভ্যালুয়েশন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন করে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সইয়ের দিনও নির্ধারণ করা হয়েছিল। চুক্তির জন্য এ তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন মহলে।
এনসিটি ইজারা দেয়ার বিরুদ্ধে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মসূচি পালন শুরু করেন। তারা বন্দরের আয় কমে যাওয়া, জাতীয় সক্ষমতাসহ বেশকিছু যুক্তি সামনে এনে সোচ্চার হন। শ্রমিকদের কর্মবিরতির প্রভাবে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দরের প্রধান তিন টার্মিনাল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গতকাল বহির্নোঙরেও পণ্য খালাস বন্ধ করে দেয়া হলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। জেটিতে অবস্থানরত জাহাজ পণ্য ওঠানামা করতে পারেনি, বহির্নোঙরে আটকে পড়ে অর্ধশতাধিক জাহাজ। রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়, আমদানি পণ্যও খালাস করা যায়নি। ফলে দেশের আমদানি-রফতানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।
এ অচলাবস্থার মধ্যে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো একের পর এক প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়ে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ চায়। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলেন, বন্দরের অচলাবস্থা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। ডেমারেজ, স্টোরেজ চার্জ বাড়ছে, এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও সরকারের কাছে তুলে ধরেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচেম বাংলাদেশ)।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ। একের পর এক বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, মামলা ও দুদকে পত্র পাঠানোর অভিযোগ তোলে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
গতকাল ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আজকে ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। আজকে সকালে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এটি এসেছে। ওনারা অ্যাপ্রিশিয়েট করেছেন। আমাদের এখানে যে নেগোসিয়েশন চলছে সেটার অগ্রগতি নিয়ে ওনারা খুশি হয়েছেন। ওনারা আশা করছেন এটা ভবিষ্যতে গ্রো করবে এবং ভবিষ্যতে এটা একটা সঠিক ডিরেকশনে যাবে।’
ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া কনসেশন চুক্তি রিভিউ করতে সময় চেয়েছে জানিয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, যে ড্রাফট কনসেশন এগ্রিমেন্ট শেয়ার করা হয়েছে, সেটার বিষয়ে তারা বলেছেন, ইট হ্যাজ বিন রিসিভড বাই আস, অ্যান্ড উই উইল রিভিউ ইট ইন ডিটেইল অ্যান্ড রিভার্ট উইথ আওয়ার অবজারভেশন ইন দ্য আর্লিয়েস্ট প্র্যাকটিকেবল টাইম। ওনারা আমাদের কাছে মূলত কিছু সময় চেয়েছেন এটাকে রিভিউ করার জন্য। খুব সম্ভবত আমাদের হাতে আর দুটি কার্যদিবস বাকি আছে, ওনারা যেহেতু সময় চেয়েছেন, আমি ধরে নিচ্ছি সম্ভাবনা আছে যে এ সরকারের আমল পার হয়ে, ইলেকশন পার হয়ে সামনে গিয়ে হয়তো এ নেগোসিয়েশনটাকে কনটিনিউ করবে।’
১ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আশিক চৌধুরী বলেন, এটা একটা গুজব। কোনো দিনই স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না। এটা একটা দ্বিপক্ষীয় নেগোসিয়েশন। এটা ক্ল্যাসিক টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার মতো না। দ্বিপক্ষীয় নেগোসিয়েশনটা কতদিন ধরে চলবে এবং কখন গিয়ে দুই পক্ষ সম্মত হবে একটা কনসেশন এগ্রিমেন্টে, এটা কারো পক্ষে বলা খুব কঠিন। এখানে চাপে পড়ে কেউ কিছু স্বাক্ষর করতে আসছে না। আমাদের জাতীয় স্বার্থকে ভুলে গিয়ে কিছু স্বাক্ষর করে ফেলব, জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে করব, এ রকম কোনো কথা কারো চিন্তা করার কারণ নেই। সমঝোতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্বাক্ষরের তারিখ নির্ধারণ হওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে আপাতত এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। গতকাল রাত ১০টায়ও চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। তবে এরপর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে আজ সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর ও মোহাম্মদ ইব্রাহীম খোকন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রমজানের পণ্য খালাস করার স্বার্থে ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে বন্দর কর্তৃপক্ষের মামলা, বিভিন্ন বন্দরে হয়রানিমূলক বদলি, আন্দোলনকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তি, বাসা বরাদ্দ বাতিল ও ১৬ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি বিষয়ে কোনো সমাধান করা না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে তাদের সংবাদ বিবৃতিতে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিরীক্ষা বিভাগের কর্মী ও আন্দোলনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিটি বিষয়ে সরকার আপাতত একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সিদ্ধান্তের পরও বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের মামলা ও বরখাস্তের মতো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতিকে আবার জটিল করে তুলছে।’
বন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনসিটি বিষয়ে সরকার অনেক সময় নিয়ে হলেও একটি সিদ্ধান্তে এসেছে। তবে বাস্তবে আজও (রোববার) চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম কার্যত অচল রয়েছে। এতে এরই মধ্যে বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।’